১লা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • অভিনয় ছেড়ে শান্তির খোঁজে ধর্মের ছায়াতলে মিডিয়া তারকারা




  • অভিনয় ছেড়ে শান্তির খোঁজে ধর্মের ছায়াতলে মিডিয়া তারকারা

    মোবারক হোসেন:

    মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে, অন্যদিকে ক্ষমা করা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম গুণ। এমন বাস্তবতায় ধর্মের পথে ফেরা প্রশংসনীয়। অবশ্যই ফেরাটা হতে হবে, স্বার্থ-শর্তহীন এবং পরিপূর্ণ ও স্থায়ী। পবিত্র কোরআনের আহ্বান-তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করো। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২০৮)

    মিডিয়াকে বলা হয় ঝলমলে রঙিন দুনিয়া। এখানে তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করেন অনেক তরুণ-তরুণীরা। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক কাঠখড় পোহানোর পর নাম-যশ ছড়িয়ে পড়লেও অনেকে এই আলো ঝলমলে আঙিনা ছেড়ে চলে যান ভিন্ন পরিবেশে। তখন তাদের চিন্তা-চেতনায় আসে ব্যপক পরিবর্তন। বেছে নেন অন্য জীবন। মিডিয়ার কাজগুলোকে তখন ভ্রান্ত ও তুচ্ছ মনে হয়। মনোনিবেশ করেন নিজ নিজ ধর্মকর্মে।

    করোনাতাণ্ডবে বিশ্বের আজ ত্রাহিদশা। ঘরবন্দি এখন সবাই, ব্যতিক্রম নন শোবিজ ও নানা অঙ্গনের তারকারাও। কারো সময়টা যাচ্ছে বন্দেগিতে, কেউ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় সমবেত হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন এবং কেউ দীর্ঘ ও বর্ণিল ক্যারিয়ারে টানছেন যবনিকা।  বাংলাদেশি শোবিজাঙ্গনে কয়েকজন অভিনেত্রী অভিনয় ছেড়ে ধর্মকর্মে ঝুঁকেছেন। অভিনয়ে আর না ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এসব তারকাদের নিয়ে জনশক্তি নিউজ-এর পাঠকদের জন্য আজকের আয়োজন:

    সুজানা জাফর:


    শোবিজে ১৬ বছর ধরে অসংখ্য বিজ্ঞাপন, মিউজিক ভিডিও, নাটকে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন সুজানা জাফর। ক্যারিয়ারের এ সময়ে এসে আলোচিত এ অভিনেত্রী মিডিয়াকে ‘গুডবাই’ জানালেন ধর্মের আত্মোপলব্ধির কারণেই। ২০১৮ সালে ওমরাহ হজ পালন করেন সুজানা। গত তিন মাস হোম কোয়ারেন্টিনে থেকে নিয়মিত কোরআন, হাদিস পড়ার কারণে ধীরে ধীরে নাকি বদলে গেছে তার মন। এমনটাই জানান তিনি।

    সুজানা জাফর বলেন, ‘গত ৩ মাসে কোরআন, হাদিস থেকে যা শিখেছি সেখান থেকে আমি যে শান্তি পেয়েছি, তা আগে কখনোই পাইনি। আমার মন থেকে মিডিয়ায় কাজের ইচ্ছে নষ্ট হয়ে গেছে। তাই আমি মিডিয়াতে আর কাজ করবো না।’

    অ্যানি খান:


    প্রায় দুই যুগের ক্যারিয়ারের মিডিয়াকে ইতি টানার ঘোষণা দিয়ে সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে এসেছিলেন ছোটপর্দার আলোচিত অভিনেত্রী অ্যানি খান। অ্যানি খান ফেসবুক লাইভে এসে বলেন, ‘গত বছর থেকেই মনে হচ্ছিল মিডিয়া থেকে দূরে সরে যাবো। ২৬ জানুয়ারি থেকে নিজের মধ্যে সিদ্ধান্তটা বেশি করে নাড়া দিতে থাকে। মার্চের ১৯ তারিখ শেষবার শুটিং করেছি। তারপর তো করোনায় সবকিছু বন্ধ হলো। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মিডিয়া ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেইনি। এ সিদ্ধান্ত আমার একান্তই ব্যক্তিগত। কারণ মৃত্যুর পর আমার হিসাব আমাকেই দিতে হবে। তাই আত্মোপলব্ধি থেকেই আমি মিডিয়ার কাজ থেকে সরে যাচ্ছি।

    অ্যানি আরও বলেন, ‘একেবারেই মিডিয়ার কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি। সার্বক্ষণিক নামাজ ইবাদতে মগ্ন আছি। ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছি, নফল নামাজ পড়ছি, কোরআন-হাদিস পড়ছি।
    প্রতিনিয়ত মৃত্যুর খবরগুলো যেভাবে শুনছি আগে সেভাবে শোনা যেত না, শুনলেও নাড়া দিতো না। বাবাকে হারালাম, চোখের সামনে কাছের মানুষগুলো ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এগুলোর কারণে রিয়ালাইজেশনগুলো এসেছে। আমি একজন মুসলিম। মুসলিম হিসেবে ধর্মীয় বিষয়গুলো যতই জানার চেষ্টা করছি ততই ধর্মবিষয়ক জ্ঞান বাড়ছে। এতে করে অনেক কিছুতে বিধিনিষেধ চলে আসছে।’

    নওশীন:


    গত বছরের মাঝ সময়ে ওমরা হজ পালন করে এসে অভিনয় থেকে মিডিয়াকে বিদায়ের কথা জানান নওশীন। যিনি একজন আরজে হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে উপস্থাপনা, মডেলিং ও অভিনয়ে নিয়মিত হন নওশীন। ক্যারিয়ারজুড়েই নানা কারণে আলোচনায় ছিলেন তিনি।

    নওশীনের বলেন, ‘অভিনয় অঙ্গন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্তটা আগে থেকেই ছিল। তবুও বিভিন্ন কারণে হয়ে উঠছিল না। এবার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করেছি। এখন থেকে আমাকে আর অভিনয়ে দেখা যাবে না। আপাতত অভিনয়ের কোনো কাজ নেই আমার হাতে। আর ভবিষ্যতেও নতুন কোনো কাজে যুক্ত হবো না।’

    হ্যাপি:


    ক্রিকেটার রুবেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে ২০১৪ সালে আলোচনায় এসেছিলেন মডেল-অভিনেত্রী নাজনীন আক্তার হ্যাপি। এ ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় আসেন হ্যাপি। ‘আমাতুলস্নাহ’ নাম ধারণ করে নিজেকে বেছে নেন ইসলামী জীবন-যাপনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে সরিয়ে নেন আগের সব ছবি।

    এই অভিনেত্রীর অসম্ভব পরিবর্তনের কারণে সেই সময়ে তাকে নিয়ে একটি বই প্রকাশ করা হয়। হ্যাপিকে নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের লেখক আবদুলস্নাহ আল ফারুক বলেন, ‘ওই রাতে তিনি (হ্যাপি) ফেসবুকে পোস্ট করা হাজার হাজার ছবি মুছে দেওয়া শুরু করেন। পরে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন।’ লেখকের স্ত্রী সাদেকা সুলতানা হ্যাপির সাক্ষাৎকার নেওয়ার অনুমতি পান। বইয়ে হ্যাপি বলেছেন, ‘নতুন শিশুর মতো আমার জন্ম হয়েছে। এখন আমার আগের জীবনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।’ হ্যাপি তাঁর সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘রিয়েল ম্যান’ মুক্তি বন্ধ করার জন্যও চেষ্টা করেন।

    জন্মসূত্রে মুসলমান নিজের ভুল বুঝে সংশোধিত হলে, তারও আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হওয়া নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন…।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৫৩)। তবে আগের কৃতকর্মের জন্য তাওবা করা জরুরি। মানুষ ভুল ও পদস্খলনের শিকার। গুনাহ করা তার স্বভাবগত অভ্যাস। কিন্তু উত্তম গুনাহগার ওই ব্যক্তি যে গুনাহর কারণে লজ্জিত হয়। আল্লাহর কাছে অশ্রু বিসর্জন দেয়। তাঁরই দিকে ফিরে আসে। করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে। ভবিষ্যতে গুনাহ না করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

    তাওবা মূলত তিন জিনিসের সমষ্টির নাম। এক. বিগত দিনগুলোতে যে গুনাহগুলো হয়ে গেছে এর মন্দ পরিণামের ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্তরে খুব অনুশোচনা সৃষ্টি হওয়া। দুই. তত্ক্ষণাৎ গুনাহ করা ছেড়ে দেওয়া। তিন. সামনের দিনগুলোতে গুনাহ না করার দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিমতো তাঁর আনুগত্য করে চলার সংকল্প গ্রহণ করা। এই তিন জিনিস পরিপূর্ণভাবে পাওয়া গেলে তাওবা পূর্ণাঙ্গতা পায়।
    কিয়ামত পর্যন্ত তাওবা কবুল হবে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, আবু মুসা আশআরি (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ রাতে তাঁর হাত সম্প্রসারণ করেন, যাতে দিনের পাপীরা তাওবা করতে পারে। আবার দিনে তাঁর হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতের পাপীরা তাওবা করতে পারে। এ অবস্থা সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া (কিয়ামত) পর্যন্ত চলতে থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৫৯)

    মৃত্যু পর্যন্ত তাওবা কবুলের সুযোগ আছে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রুহ গলদেশে এসে আটকাবার আগ পর্যন্ত আল্লাহপাক বান্দার তাওবা কবুল করেন।’ (মিশকাত, হাদিস : ২৩৪৩)। মহান আল্লাহ আমাদের তাওবার তাওফিক দান করুন। আমিন।

    আরও পড়ুন