১৬ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

করোনায় বাড়ছে বেকারত্ব, অনেকের আয়ের উৎস বন্ধ

কোভিড-১৯–এর কারণে মানুষের আয় কমে গেছে, বেড়েছে বেকারত্ব। যাদের আয় কম, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যাঁদের আয়ের উৎস একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) গতকাল দেশের ২৯ হাজার ৯০৯ জনের ওপর জরিপ পরিচালনা করে এই তথ্য দিয়েছে। জরিপটি পরিচালনা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ। একই অনুষ্ঠানে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়েক সেন একটি গবেষণা উপস্থাপন করে জানান, করোনার কারণে দেশের ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। কোভিডের ছায়ায় বসবাস, খাপ খাওয়ানো, সমন্বয় ও প্রতিক্রিয়া শীর্ষক এক বিশ্লেষণী সংলাপে জরিপের ফল উপস্থাপন, দারিদ্র্য হারের এ প্রক্ষেপণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিষয়ে একটি গবেষণা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, অনলাইনে গত ৫ মে থেকে ২৯ মে পর্যন্ত সময়ে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। কমপক্ষে মাধ্যমিক পাস এমন মানুষকে জরিপের জন্য বেছে নেওয়া হয়। পুরুষ ও নারী অনুপাত হচ্ছে ৬৭:৩৩। জরিপে অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৫৯ শতাংশের কাজ আছে, ১৭ শতাংশ করোনার আগেই বেকার ছিলেন, আর ১৩ শতাংশ করোনার প্রাদুর্ভাবের পরে কাজ হারিয়েছেন। আর ৬৩ শতাংশ পরিবারে উপার্জনকারী একজন, ২৫ শতাংশ পরিবারে দুজন, আর ৬ শতাংশ পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই।
আয় কমেছে

প্রশ্ন করা হয়েছিল, আগের মাসের তুলনায় তাঁদের আয়ের অবস্থা কী। মাসে ১৫ হাজার টাকার কম আয় করেন এমন ৫৮.০৭ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের আয় কমে গেছে। আয় একদম বন্ধ হয়ে গেছে ২৩.২ শতাংশের, ১৮.৫১ শতাংশের আয় একই রকম আছে। ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা মাসে আয় করেন, তাঁদের পরিস্থিতি একটু অন্য রকম। ৪৭.২৬ শতাংশের আয় কমে গেছে, ৪৩.২১ শতাংশের একই রকম আছে, ৯.০৪ শতাংশের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। আর যাঁদের আয় ৩০ হাজার টাকার বেশি, তাঁদের ৫৩.২৬ শতাংশের আয় একই আছে, ৩৯.৪ শতাংশের কমেছে, ৬.৪৬ শতাংশের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, যাঁদের আয় কম, তাঁরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কমেছে পরিবারের আয়
পরিবারের আয় কতটা কমেছে, তা–ও জানতে চাওয়া হয় জরিপে। দেখা গেছে, মাসে ১১ হাজার টাকার কম আয় ছিল এমন ৫৬.৮৯ শতাংশ পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে, ৩২.১২ শতাংশের আয় কমে গেছে এবং ১০.৭৯ শতাংশের আয় আগের মতোই আছে। ১১ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় ছিল এমন পরিবারের মধ্যে ৪০.৮১ শতাংশের আয় আগের মাসের তুলনায় কমে যাওয়ার কথা বলেছে। ৩৭.০১ শতাংশের আয় একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। আর ৩০ হাজার টাকার বেশি আয় আছে এমন পরিবারের চিত্র একটু ভিন্ন। তাঁদের ৪৫.৭৪ শতাংশেরই আয় একই আছে, কমেছে ৩৮.৩৮ শতাংশের, বন্ধ হয়ে গেছে ১৫.১৭ শতাংশের।

বেকার বাড়ছে
জরিপ অনুযায়ী, করোনার কারণে সব জেলাতেই বেকারত্ব বেড়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে সিলেটে কর্মসংস্থান হারানোর হার বেশি। আর শহর এলাকার তুলনায় গ্রামে কাজ হারিয়েছে বেশি। করোনা আগে গ্রামে বেকারের হারও ছিল বেশি।

পারিবারিক সহিংসতা
করোনাকালে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ২৫ শতাংশ বলেছে পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে। তাদের মধ্যে আবার ৯৪ শতাংশ বলেছে, সহিংসতার ধরন মৌখিক, ১ শতাংশ শারীরিক আঘাতের কথা বলেছে, আর ৫ শতাংশ বলেছে মুখে মুখে এবং শারীরিক আঘাত—দুটোই ঘটছে।

পণ্যের দাম বেড়েছে ১০%
জরিপে অংশ নেওয়া বেশির ভাগ মানুষ খাদ্যের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের মতো বৃদ্ধির কথা জানান। জরিপে উঠে আসে যে বেশির ভাগ মানুষের খাদ্যব্যয় বেড়েছে। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কমেছে। জরিপে আরও উঠে আসে, নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য মজুত তেমন একটা নেই।
দুই মাস চলার মতো অর্থ আছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে মাসিক ১৫ হাজার টাকার কম আয়ের মাত্র ২ দশমিক ২৪ শতাংশ, ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের ৪ শতাংশের কিছু বেশি এবং ৩০ হাজার টাকার বেশি আয়ের ১০ শতাংশ ইতিবাচক উত্তর দিয়েছে। এর মানে হলো, বিরাট অংশের মানুষের কাছে দুই মাস চলার মতো অর্থ নেই।

মাস্ক পরেন বেশির ভাগ মানুষ
করোনাকালে নারীদের ৩৪ শতাংশ ও পুরুষের ৩১ শতাংশ পুরোপুরি সঙ্গনিরোধ অবস্থায় ছিলেন। ঘরে থাকার বিষয়টি মানেননি ৯ শতাংশ নারী ও পুরুষ। ৯৪ শতাংশের নারী ও পুরুষ বেশি নিয়মিত মাস্ক পরেছেন। যাঁদের আয় বেশি, তাঁদের মধ্যে মাস্ক পরার প্রবণতা সামান্য বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া ২৩ শতাংশ মানুষ দিনে ১০ বার বা তার বেশি হাত ধুয়েছেন। ২০ শতাংশের হাত ধোয়ার হার দিনে চারবার বা তার কম।

২.৫%-এর মধ্যে করোনা উপসর্গ
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে তাঁদের কোনো অসুস্থতা ছিল কি না। জবাবে ১০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাঁদের অসুস্থতা ছিল। জরিপ অনুযায়ী, সন্দেহজনক করোনায় আক্রান্ত বেশি ছিল চট্টগ্রামে। এরপর রয়েছে ঢাকা জেলা, খুলনা, যশোর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, নরসিংদী, বরিশাল ও কক্সবাজার।

জরিপের ফল উপস্থাপন করে কে এ এস মুরশিদ চারটি সুপারিশ উপস্থাপন করেন। যেমন সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি হ্রাস এবং সব ধরনের জমায়েত বন্ধ, সবাই যাতে মাস্ক ও সাবান ব্যবহার করে, তা নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে কিছু সূক্ষ্ম পদক্ষেপ ও সচেতনতা কর্মসূচির সমন্বয় এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার মানুষদের জন্য হেল্পলাইন তৈরি করা।

আরও পড়ুন