১৬ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

গর্দভের পিএইচডি ডিগ্রী নয়, জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা চাই

মোঃ গালিব হোসেন:

রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই জানা গল্পটা দিয়ে শুরু করি – “অশ্বারোহী এক ব্যক্তি টগবগ ঘোড়া ছুটিয়ে যাওয়ার সময় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড দেখলেন। সাইনবোর্ডে লেখা আছে, এখানে পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হয়। অশ্বারোহী যথাস্থানে এলেন এবং জানলেন যে, ১০০ ডলার জমা দিয়ে পিএইচডি প্রসেসড হওয়ার জন্য আধঘণ্টা অপেক্ষা করলে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী হতে পারবেন। তিনি ১০০ ডলার জমা দিলেন এবং আধঘণ্টা পর পিএইচডি ডিগ্রি পেয়ে গেলেন। সানন্দে ফেরার পথে তার মনে হলো, আর ১০০ ডলার খরচ করলে তিনি ঘোড়াটার জন্যও একটা পিএইচডি নিতে পারতেন। তিনি ফিরে গিয়ে ঘোড়ার নামে যখন টাকা জমা দিতে যাচ্ছেন, জানতে পারলেন এ বিশ্ববিদ্যালয় অশ্বদের পিএইচডি দেয় না;কেবল গর্দভদেরই দেয়।”

লেখক তার এ গল্পটিতে তথাকথিত সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষার্জন নয় জ্ঞান ভিত্তিক সুশিক্ষার ইঙ্গিত করেছেন তা বুঝতে আমাদের কারো অসুবিধা হবার কথা নয়।

আজকাল আড়াই-তিন বছর বয়স থেকেই ছাত্র জীবন শুরু হয়। শরীরের ওজনের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের বাচ্চাদের বইয়ের ব্যাগটি বড় হতে থাকে। কখনো বা বই-খাতাসমেত ব্যাগের ওজন শিশুটির শরীরের ওজনকেও ছাড়িয়ে যায়। শিশুটি কিছু বুঝে উঠার আগেই তাকে পরীক্ষা নামক এক পদ্ধতির ভেতর প্রবেশ করতে হয়। এ ব্যপারে আমাদের অভিভাবকদের প্রত্যাশার যেন শেষ নেই। সন্তানকে ক্লাসের ফার্স্ট হতেই হবে। পরীক্ষার খাতায় প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর তাকে লিখতেই হবে, নইলে স্কুল গেটেই হয়তো ঐ শিশুটির বাবা-মায়ের ইজ্জত ভুলুন্ঠিত হয়ে যাবে! কম নাম্বার পেলে মান-সম্মান কিছু থাকে আর!! গোল্ডেন-জিপিএ ফাইভ ইত্যাদি ইত্যাদির সাথে আজকাল অভিভাবকদের মান-সম্মান যে কত শক্তভাবে জড়িয়ে গেছে তা পরিমাপ করা কঠিন । আমরা আমাদের সন্তানদের আনন্দ উপভোগের জায়গাটি দেখি না, বরং কতগুলো বইয়ের পাতা সে মুখস্ত করে পরীক্ষার হলে উগড়ে দিতে পারল সেটার দিকে তাকিয়ে থাকি। একই সাথে শিক্ষা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য থেকে আমরা আমাদের সন্তানদের যোজন যোজন দূরে ঠেলে দেই।

শিক্ষা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে আত্ম-উপলদ্ধির কথা, নিজেকে জানার বাস্তবতা। কোন কিছু শেখার পর মানব কল্যাণে তার যথাযথ প্রয়োগই হলো শিক্ষা। শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর নিজেকে, তার পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজ-সংস্কৃতি, ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, জীবন সংগ্রাম, মানব সভ্যতা ইত্যাদি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়। শিক্ষা একজন মানুষকে সচেতন, সংবেদনশীল, নৈতিক, সৃষ্টিশীল, আত্মপ্রত্যয়ী ও মানবিক গুণে গুণান্বিত করে তোলে।

মহিয়সী নারী হেলেন কেলার কে সবাই কেন এত মনে রেখেছে! তিনি সুশিক্ষার আলোতেই অন্ধ চোখে পুরো পৃথিবীটাকে দেখেছেন। এক কথায় তিনি শিক্ষার উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন এভাবে-শিক্ষার চুড়ান্ত ফল হচ্ছে সহনশীলতা।

কাজেই এখন ভাবার সময় এসেছে আমাদের মধ্যে এই গুণ গুলোর কোনটি কতটুকু জাগ্রত হয়েছে। আমরা যতদিন কেবলই ফলাফলমূখী শিক্ষার পেছনে ছুটব ততদিন আমাদের অর্জন হবে বিপরীত। শুধুই ভাল ফলাফল ও দামি সার্টিফিকেট হয়তো আপাত আনন্দের বিষয় হতে পারে, হতে পারে উচ্চাভিলাষি ক্যারিয়ারের সাময়িক প্রারম্ভ, কিন্তু তা দীর্ঘ মেয়াদে দেশ ও সমাজের কতটুকু কাজে আসে তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।

প্রশ্ন আসতে পারে, তাবে কি আমাদের ছাত্ররা ভাল ফল করবে না? অবশ্যই ভাল রেজাল্ট করবে এবং আরো ভাল কিছু করার চেষ্টায় থাকবে। শুধু ভাল ফলাফলের জন্য পড়াশুনা করলে সুশিক্ষা অর্জন হবে না, তবে সুশিক্ষা অর্জনের জন্য পড়াশুনাটা করলে ফলাফল ভাল হওয়াটা নিশ্চিত! সুশিক্ষা কেবল পাঠ্য বই থেকে আসে না। জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার জন্য পাঠ্য বইয়ের সমান্তরালে বয়সোপযোগী অন্যান্য বইয়ে পরিভ্রমণ জরুরী। তবেই বৃদ্ধি পাবে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, বৃদ্ধি পাবে কল্যাণমুখী প্রবণতা। মহাকবি শেলির সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ছে, “আমরা যতই অধ্যয়ন করি ততই আমাদের অজ্ঞানতাকে আবিষ্কার করি”। আর অজ্ঞানতাকে আবিষ্কার করতে পারলে তা দূর করে নিজেকে আলোকিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

যদি দেশের ১০০ জন নাগরিককে জিজ্ঞাসা করা হয়, এই মূহুর্তে আমাদের সমাজের প্রধান সমস্যা কী? প্রায় শতভাগই উত্তর দেবে-দুর্নীতি! দুর্নীতি দূর করুন, দেশের সব সমস্যা একদিনে সমাধান হয়ে যাবে। আমার এ কথায় একমত হতে দ্বিধা নাই। তাইতো, দূর্নীতি দূর করতে পারলে দেশ কেবল মধ্যম আয় নয় রীতিমত উন্নত দেশের তালিকায় নাম লেখাতে বাধ্য। এজন্য আমাদের চেষ্টারও কমতি নেই। কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে আইন, কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন -বাড়ানো হয়েছে তার সক্ষমতা, কাজ করছে অন্যান্য সংস্থাগুলোও। কিন্তু পত্রিকার পাতা খুললে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকা নয়-ছয়ের খবর দেখি। আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় আর ওদিকে তাদের বিদেশের একাউন্ট স্ফীত হয়!

আসলে এ সমস্যার মূল হয়ত আমরা এখনো স্পর্শ করতে পারিনি। সুশিক্ষা যতদিন পর্যন্ত তার হৃদয়ে বাসা না বাধবে, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তার চোখ যতদিন পর্যন্ত অশ্রুসজল না হবে ততদিন পর্যন্ত তার ভেতর থেকে দুর্নীতি করার ‘নির্লজ্জতা’ দূর হবে না। রবি ঠাকুরের সেই মহান উক্তিটি মনে করিয়ে দেই- “ মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা আর সমস্তই তার অধীন ”। হয়তো আমাদের আরো অনেকটা সময় সেই সুদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে -আজকের জন্ম নেয়া শিশুটি যতদিন পর্যন্ত না মনুষ্যত্বের শিক্ষাটা অর্জন করে আমাদের সমাজকে বদলে দিতে আসে।

আমরা সবসময় আমাদের সন্তানের জন্য সেরাটাই চাই। আমরা চাই আমাদের সন্তান সেরা ক্রিকেটার হয়ে উঠুক অথচ আমরা তাকে মাঠে ব্যাট নিয়ে নামতে দিতে চাইনা। আমরা চাই আমাদের সন্তান সেরা বিজ্ঞানী হয়ে উঠুক অথচ আমরা তাকে সায়েন্স ফিকসন পড়তে দেখলে বিরক্ত হই। আমরা চাই সে সেরা ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার হয়ে উঠুক কিন্ত সে কি হতে চায় সেটা বুঝতে চাই না। আমরা কেবল আমাদের স্বপ্নটাকে তার উপর চাপাতে চাই, তাকে স্বপ্ন দেখতে দিতে চাইনা। এতে পরীক্ষায় ভাল ফল হয়ত আসে – কাঙ্খিত সফলতা আসেনা। ফলাফলে এগিয়ে থাকি – পিছিয়ে যাই আপন আলোয় আলোকিত প্রজন্ম সৃষ্টিতে। আমরা যখন আমাদের সন্তানদের স্বাধীনভাবে স্বপ্ন দেখতে দিব, বাড়বে তার কল্পনা শক্তি। কল্পনা যে জ্ঞানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ !

আমাদের আজ সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে আমরা কি গর্দভের পিএইচডির জন্য ছুটব নাকি মনুষ্যত্বের প্রকৃত শিক্ষাটা অর্জন করে আপন আলোয় আলোকিত হয়ে কল্যাণমুখী সমাজ গড়তে নতুন প্রজন্মকে উদবুদ্ধ করব।

লেখক:
মোঃ গালিব হোসেন, সহকারী অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ,
সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।

আরও পড়ুন