১লা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
সিঙ্গাইর পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বাশার জয়ী আজ সিঙ্গাইর পৌরসভা নির্বাচন, সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা নৌকার বিজয় নিশ্চিত, আ.লীগ প্রার্থী বাশার মানিকগঞ্জ বার নির্বাচনে সভাপতি-সম্পাদকসহ ১১ পদে বিএনপি প্রার্থী জয়ী সিঙ্গাইর পৌর নির্বাচনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে একাট্টা আ.লীগ মানিকগঞ্জ বার নির্বাচন: এবারও আলোচনায় সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী লুৎফর লেবানন বিএনপির ভার্চুয়াল প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে লেবানন আ’লীগের আলোচনা সভা যথাযথ মর্যাদায় লেবাননে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন অগ্নিকাণ্ডে সিঙ্গাইর সদর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ভস্মীভুত

পদে পদে চ্যালেঞ্জ, করোনাযুদ্ধে তবুও লড়ছেন সাংবাদিকরা

বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে অসহায়ভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন একের পর এক গুরুতর অসুস্থ মানুষ। দেশে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন, নানা গুঞ্জন। সত্যটা কী তা জানা দরকার। একেবারে সরেজমিন চিত্র দরকার। কতটা ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার, সীবাবদ্ধতা কোথায় কতটা- সেই সত্য মানুষের সামনে দৃশ্যমান করতে পারলেই অবসান হবে গুজবের। সেই দায়িত্ব পালন করবে কে?

সংকটকালে ওই কঠিন দায়িত্বটি পালন করছে সংবাদমাধ্যম। বিশেষ করে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোকে ঘিরে যত প্রশ্ন আর গুঞ্জন তার বিপরীতে প্রকৃত সত্য তুলে ধরেছেন সাংবাদিকরাই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সবার আগে কভিড-১৯ হাসপাতালে প্রবেশ করেছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ২৪ ঘণ্টার সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের স্টাফ রিপোর্টার জিনিয়া কবির সূচনা। সমকালের সঙ্গে আলাপে তিনি জানিয়েছেন কীভাবে জয় করলেন এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ রিপোর্টের চ্যালেঞ্জ। আর এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন বলেই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাংবাদিকরাও সম্মুখসারির যোদ্ধা। এই যোদ্ধারা কি সত্যিই নিজেদের সুরক্ষিত রেখে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন? কতটা পাচ্ছেন অফিসের সহযোগিতা? সরকারি সহযোগিতাই বা কতটা পাচ্ছেন? সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কীভাবে প্রণোদিত হতে পারেন সাংবাদিকরা? সমকালকে এসব প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।

যেভাবে সম্মুখযোদ্ধা সাংবাদিকরা : জিনিয়া কবির সূচনা জানালেন, কভিড-১৯ হাসপাতালগুলোর অন্দরে চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা আছে সে সম্পর্কে নানা গুঞ্জন তিনি শুনেছেন। সাধারণ মানুষ হিসেবে নানা গুজব তাকেও বিভ্রান্ত করেছে। কিন্তু একজন সাংবাদিক হিসেবে সত্যটা কীভাবে সামনে আনতে পারেন সে প্রশ্ন প্রথমে তিনি নিজেকেই করেছেন। এরপর অফিস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা তাকে প্রথমেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন। হাসপাতালে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পর রাজি হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অফিস থেকে সব ধরনের সুরক্ষা দিয়ে অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানো হয়। যথাযথভাবে পিপিই বা সুরক্ষা পোশাকসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে রোগীরা তাদের অভিযোগ প্রকাশ করেন চিকিৎসকদের সামনেই। চিকিৎসকরাও তাদের প্রচেষ্টা এবং সীমাবদ্ধতার কথা বলেন। হাসপাতালের অভ্যন্তরের চিত্রটা প্রকৃত অর্থে কী, নূ্যনতম চিকিৎসা সেবার জন্য যা প্রয়োজন তার কতটা আছে, কতটা আরও দরকার এবং কর্তৃপক্ষ ও সরকার আরও কী ব্যবস্থা নিচ্ছে- সবকিছুই সাধারণ মানুষের সামনে উঠে আসে টিভির পর্দায় সূচনার সরেজমিন প্রতিবেদনে।

সূচনা জানান, চিত্র ধারণের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে তাদের জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়া শেষ করে। তার পরও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রিপোর্ট করার কারণে সূচনা ও তার সঙ্গের ক্যামেরাপারসন আজিম খান রনি অফিসে না এসে প্রথমেই বাসায় যান, নিজেদের জীবাণুমক্ত করেন, ব্যবহূত ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করে তারা অফিসে আসেন। এরপর অন্যান্য সহকর্মীর সঙ্গে যথাযথ দূরত্ব রক্ষা করে রিপোর্টটি তৈরি করেন। তার পরও মনের ভেতরে একটা ভয় তো থেকেই যায়, যখন প্রতিদিন বাড়তে থাকে সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা। তবে ভয় থাকলেও ভয় পাওয়ার সুযোগ যে নেই পেশাদার সাংবাদিকের!
সূচনার মতো আরও সাংবাদিক আছেন, যারা নানাভাবে এই ঘোর সংকটে সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। সবাই কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সূচনার মতো অফিসের সহযোগিতা পাচ্ছেন না। বরং অফিসের ভেতরেই তারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন, এমন উদাহরণও আছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় একশ’ সাংবাদিক। মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় প্রকট চ্যালেঞ্জ : সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম সমকালকে বলেন, মিডিয়া এখন একটি কঠিন সংকট মোকাবিলা করছে। সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে সাংবাদিকদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ দুটি। প্রথমত, সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী। এটা প্রতিটি অফিসের নিশ্চিত করা প্রথম দায়িত্ব। যখন কোনো অফিস খোলা রাখা হবে, তখন সেই অফিস কর্তৃপক্ষকেই এটা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। মিডিয়াকে টিকিয়ে রাখতে নিজেদেরই আগে দায়িত্ব নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি সবচেয়ে বড় সহায়তা হতে পারে বিজ্ঞাপনের বকেয়া বিলগুলো পরিশোধ করা। দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলোর সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল বাবদ প্রায় ১২০ কোটি বকেয়া আছে। এই টাকা এখন পরিশোধ করলে সেটা একটা বড় সহায়তা হয়। কারণ প্রণোদনা হিসেবে ঋণ দিলে প্রশ্ন উঠবে, সেই ঋণ কাকে দেওয়া হবে, কে শোধ করবে? একই সঙ্গে টেলিভিশনগুলোতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ফ্রি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। এখন এসব বিজ্ঞাপনের বিপরীতে সরকারের বিল দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকার সাংবাদিকদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল নির্ধারিত করে দিলে সেটা হবে বড় সহায়তা।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, এখন পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে তিনটি অবস্থা দেখা যাচ্ছে। অনেকে আছেন যারা এ সময়ে দায়িত্ব পালনে অফিসের সহায়তা পাচ্ছেন, বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। অনেকে আছেন যারা কাজ করছেন কিন্তু বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন না। এরপর অনেকে আছেন যারা চাকরিচ্যুত হয়েছেন এবং অসচ্ছল অবস্থায় রয়েছেন। এই তিন ক্যাটাগারিতে সাংবাদিক ইউনিয়নকে তালিকা করতে হবে। তারপর তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। পত্রিকার বকেয়া বিজ্ঞাপন বিল, নতুন বিজ্ঞাপন, ক্রোড়পত্র দেওয়ার সময় এই টাকা সাংবাদিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় করা হবে তার একটা নিশ্চয়তা বিধানের পদক্ষেপ সরকারকে নিতে হবে।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, করোনা মহামারির বিরুদ্ধে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে সাংবাদিকরা বলতে গেলে সরকারি কোনো সহযোগিতা বা প্রণোদনা পায়নি। এর মধ্যে কয়েকটি পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমে বেতনও দেওয়া হচ্ছে না। সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত হলে অফিসও যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সরকারি সহায়তাও পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জটা প্রকট হয়ে উঠেছে।

দুটি সংগঠনের উজ্জ্বল ভূমিকা : এ সময়ে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাংবাদিকদের দুটি সংগঠন উজ্জ্বল ভূমিকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সদস্যদের জন্য জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা, কার্যালয়ে জীবাণুমুক্তকরণ চেম্বার স্থাপন, সদস্যদের করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছে। সর্বশেষ অসচ্ছল, চাকরিচ্যুত এবং বেতন না পাওয়া এবং বেকার সাংবাদিকদের বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে। ডিআরইউ সহসভাপতি নজরুল

কবীর বলেন, সব উদ্যোগই নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহায়তায়। তিনি বলেন, সরকারের কাছে একটাই চাওয়া- সাংবাদিকদের চিকিৎসার জন্য অন্তত একটি হাসপাতাল বিশেষায়িত করে দেওয়া হোক। যেন সহকর্মী আসলামের মতো আর কোনো সাংবাদিককে বিনা চিকিৎসায় মরতে না হয়।

ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারও (বিজেসি) সদস্যদের মধ্যে সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ, খাদ্য সহায়তা প্রদান এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। সংগঠনের ট্রাস্টি রাশেদ আহমেদ জানান, সব সদস্যকে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে। যারা চাকরিচ্যুত ও বেকার তাদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও গাজী গ্রুপ, অলওয়েল গ্রুপ ও ব্রা্যকের সহায়তায় সদস্যদের চিকিৎসা সেবাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, চিকিৎসা সেবার বিষয়টি সব সাংবাদিকের জন্যই উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন