২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • পাতানো মামলায় আটকে আছে ভোলার ১পৌরসভাসহ ১১ইউপি নির্বাচন




  • পাতানো মামলায় আটকে আছে ভোলার ১পৌরসভাসহ ১১ইউপি নির্বাচন

    ডেস্ক রিপোর্ট: ভোলা জেলায় এক পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নে দীর্ঘ কয়েক ট্রাম নির্বাচন বন্ধ থাকায় মেয়র, চেয়ারম্যান ও সদস্য পদের চেয়ারে যুগ যুগ ধরে আসীন রয়েছেন আগের নির্বাচিতরাই। আদালতে সীমানা নির্ধারণের জনৈক ব্যক্তিদের পাতানো মামলা থাকার কারণে এসকল এলাকায় নির্বাচন হচ্ছে না। এক চেয়ারম্যানসহ একাধিক ইউপি সদস্য মৃত্যুবরণ করলেও পুরণ হচ্ছেনা ওই সকল শূন্য পদ। একই ব্যক্তি র্দীঘ বছর ধরে ক্ষমতার চেয়ারে বসে থাকার ফলে সকল প্রকার নাগরিক সুযোগ সুবিধা থেকে অনেকটা বঞ্চিত হচ্ছে এমটাই মনে করেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। এ অবস্থায় এই সকল ইউনিয়নে দ্রুত নির্বাচনের জোর দাবী জানিয়েছে তারা।
    জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, তজুমদ্দিন উপজেলার বড় মংলচড়া, সোনাপুর ইউনিয়ন, লালমোহন পৌর সভা ও একই উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ, কালামা, চরভূতা ও লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়ন, দৌলখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়ন, চরফ্যাশন উপজেলার নুরাবাদ, আহাম্মদপুর, আসলামপুর, ওমরপুর ইউনিয়নে সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত জটিলতার মামালা থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।
    অনুসন্ধানে জানা গেছে, সারা দেশের ন্যায় গত ২০০৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন হাসান মাসুদ বাবুল। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ দায়িত্বে থাকার পর চেয়ারম্যান হাসান বাবুল গত ১২ মার্চ ১৯ ইং তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর ৪নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. কামাল হোসেন প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমানে দায়িত্বপাল করছেন। এর আগে গত ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর মারা যান ১ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আবুল খায়ের মাস্টার। তার আগে গত ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারী মৃত্যুবরণ করেন ১,২,৩ নং ওয়ার্ড সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য হাসনা বেগম। একই বছর ২৭ মে মারা যান আরেক ৭,৮,৯ নং ওয়ার্ড সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম।
    পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন জানান, চেয়ারম্যান ও ৪ জন ইউপি সদস্য মৃত্যুবরণ করায় ভোটাররা তাদের নাগরিক সুবিধা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশের এলাকার সাথে সীমানা নির্ধারণের মামলা থাকায় এখানেও নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।
    একই দিনে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন বড় মলংচড়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন মো. নুরনবী সিকাদর। তার পর থেকে এই ইউনিয়নে এখন পর্যন্ত আর কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এর মধ্যে ২০১৬ সালের জুন মাসে ১,২,৩ নং ওয়ার্ড সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য খতেজা বেগম মরা যান। ২০০৫ সাল থেকে ৪,৫,৬ নং ওয়ার্ড সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য আরজু আনাম পরিষদের সকল দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত রয়েছেন। এবং ৭,৮,৯ নং ওয়ার্ড সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য জান্নাতুল ফেরদাউস সরকারি চাকরি করার কারণে তিনিও পরিষদের কার্যের তালিকায় অনুপস্থিত রয়েছেন।
    ইউপি চেয়ারম্যান মো. নুরনবী সিকাদর বলেন, তার ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড ও পার্শ্ববর্তী সোনাপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ জটিলতার মামলা থাকার কারণে এই ইউনিয়নে গত ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে নির্বাচন হচ্ছে না। তবে মামলার বাদীকে এমন প্রশ্নে তিনি তাকে চিনেন বলে জানান চেয়ারম্যান।
    অপরদিকে লালমোহন উপজেলার ৭নং পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ২০০৩ সালের ১০ ফ্রেরুয়ারীতে। এতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ওই ইউনিয়নে আর কোনো নির্বাচন হয়নি। র্দীঘ দেড় যুগ সময় ধরে চেয়ারম্যান হিসাবে চেয়ারে আসীন রয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন সেই ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. মোহাসিন হাওলাদার।
    ২০১১ সালে ইউনিয়নটির একটি ভোট কেন্দ্র বিচ্ছিন্ন চর কচুয়াখালীতে স্থানান্তরের দাবী জানিয়ে চেয়ারম্যানের বিশ্বস্ত কর্মী জনৈক সিরাজুল হক নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে উচ্চ আদালতে দায়িত্ব ভোগের জন্য এই মামলাটি ইউপি চেয়ারম্যানেই করান বলে স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে। যার কারণে র্দীঘ প্রায় দেড় যুগ যাবৎ ইউনিয়নটিতে বন্ধ রয়েছে নির্বাচন। একারণে তার বাড়িতে বসে পরিষদের কর্যক্রম ও নিজের মন মত চালাচ্ছেন। ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ সীমানা নির্ধাণের মামলার কথা অস্বীকার করে বলেন, ইউনিয়নটিকে দুই ভাগে ভাগ করার কথা রয়েছে। যার কারণে নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।
    এছাড়া লালমোহন পৌরসভার সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১০ ডিসেম্বর ২০১০ সালে। এতে মেয়র পদে নির্বাচিত হন এমদাদুল ইসলাম তুহিন। বরিশাল বিভাগে ২৪ টি পৌরসভা ৯টি করে ওয়ার্ড দিয়ে গঠিত করা হলেও বর্তমান পৌর মেয়র তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর নয়া কৌশল অবলম্বন করে ৯টি ওয়ার্ড থেকে ১২ টি ওয়ার্ড বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। তার প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১৩ জুন গেজেট প্রকাশ করলেও অদৃশ্য কারণে এখনো নির্বাচন হচ্ছে না এ পৌরসভায়।
    এব্যাপারে পৌর মেয়র এমদাদুল ইসলাম তুহিন বলেন, পার্শ্ববর্তী কালমা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের কিছু অংশকে পৌর ১০ ও ৬ নং ওয়ার্ডের কিছু অংশকে পৌর ১১ নং ওয়ার্ড ও চরভূতা ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডকে পৌর ১২ নং ওয়ার্ড করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। সাড়ে তিন বছর আগে গেজেট প্রকাশ করা হলেও এখনো কেন নির্বাচন হচ্ছেনা এমন প্রশ্নে মেয়র বলেন, চরভূতা ইউনিয়নের জনৈক ব্যক্তির সীমানা নির্ধারণের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে নির্বাচন হচ্ছে না।
    লালমোহন উপজেলার আরো তিনটি ইউপি নির্বাচন হয় সর্বশেষ ২০১১ সালের ৩১ মার্চ। এর মধ্যে কালমা ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মো. আকতার হোসেন, চরভূতা ইউপি চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান টিটব, লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিয়া। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের সাথে সিমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিরোধ দেখিয়ে নিজেদের কাছের আত্মীয় জনৈক ব্যক্তি দিয়ে উচ্চ আদলতে মামলা করিয়ে ক্ষমতার চেয়ার নিয়ে বসে আছেন এসকল চেয়ারম্যানরা এমনটাই অভিযোগ করেছেন স্থানীয়বাসিন্দার।
    চরফ্যাশন উপজেলার নুরাবাদ ইউনিয়নে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ২০১১ সালের ২ জুন। এতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মো. মোস্তাফিজুর রহমান। একই ইউনিয়নের কিছু অংশ কেটে নতুন আহম্মদপুর ইউনিয়ন নবগঠিত হওয়া জনৈক ব্যক্তি মামলা করায় নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। একই উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নে নির্বাচন হয় ২০১১ সালের ২ এপ্রিল। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন একেএম সিরাজুল ইসলাম। এই ইউনিয়নের কিছু অংশ কেটে নতুন ওমরপুর ইউপি গঠিত হওয়ায় সীমানা নির্ধারণের মামলা থাকায় নির্বাচন বন্ধ রয়েছে এই ইউনিয়নেও।
    দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়ন সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ২০১১ সালের ২৯ মার্চ। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন মো. মোশারফ হোসেন। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা থাকার কারণে তাকে অপসারণ করা হয়। ২০১৭ সালের ২২ জুন থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন ৫ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন। গত ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর এই ইউনিয়নে ভোট গ্রহণের তারিখ থাকলেও তা অদৃশ্য কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়।
    এসকল ইউনিয়নের স্থানীয় ভোটাররা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একই ব্যক্তি বার বার ক্ষমতার চেয়ারে থাকায় তারা পরিষদের কার্যক্রম চালাচ্ছেন মনগড়া ভাবে। সাধারণ জনগণ প্রয়োজনের সময় পরিষদে গিয়ে জন প্রতিনিধিদের না পেয়ে তারা সকল প্রকার নাগরিক সেবা থেকে অনেকটা বঞ্চিত হচ্ছে।
    তরা আরো বলেন, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের সাথে সিমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিরোধ দেখিয়ে নিজেদের বিশ্বস্তকর্মী বা কাছের আত্মীয় জনৈক ব্যক্তি দিয়ে উচ্চ আদলতে মামলা করিয়ে ক্ষমতার চেয়ার নিয়ে বসে আছেন এসকল চেয়ারম্যানরা।
    তারা আরো বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তন না হলে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেনা যার ফলে জনগণও সুফল পায়না। এ অবস্থায় দ্রুত এই সকল ইউনিয়নে নতুন নির্বাচনের জোর দাবী জানিয়েছে স্থানীয় নাগরিকরা।
    সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা আবু তৌয়ব বলেন, ব্যক্তি স্বার্থের চেয়েও জনগণের মৌলিক চাহিদা আমাদের আগে দেখতে হবে। কারণ জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরনের জন্য তারা জনপ্রতনিধি নির্বাচিত করেন। তাই জনগণের মৌলিক চাহিদা আদায়ের জন্য অতি শিগগিরই এ ইউনিয়নে নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
    ভোলা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন আল মামুন বলেন, সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে উচ্চ আদালতে মামলা থাকার কারণে আমরা ১টি পৌরসভাসহ আরও ১১ টি ইউনিয়ন নির্বাচন দিতে পারছিনা। এর আগে আমরা ৪ টি বন্ধ থাকা ইউনিয়নে মামলা নিষ্পত্তি হাওয়ার পর নির্বাচন সম্পন্ন করেছি। আদালত থেকে নিষ্পত্তির নির্দেশনা আসলে বন্ধ থাকা ইউনিয়নগুলোতে আমরা দ্রুত নির্বাচন শেষ করবো বলে জানান তিনি।

    এস রহমান/জনশক্তি

    Print Friendly, PDF & Email

    আরও পড়ুন