১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
লেবানন আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত সিঙ্গাইরে দেয়ালে অঙ্কিত বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃতি কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের আজ শুভ জন্মদিন বিএনপির ৪৩ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে মালয়েশিয়ায় ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত যে কারণে হত্যার শিকার শিশু আল-আমীন, রহস্য উদঘাটন সিঙ্গাইর থানার ওসির পিতার মাগফিরাত কামনায় দোয়ার মাহফিল কানাডা প্রবাসী প্রয়াত জয়নুল আবেদীন স্বরণে দোয়ার মাহফিল তিনদিন পর সিঙ্গাইরে নিখোঁজ শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার মজিবুর রহমান মোল্যার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিল মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে সিঙ্গাইরে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা

যে কারণে হত্যার শিকার শিশু আল-আমীন, রহস্য উদঘাটন

মোবারক হোসেন:

মোবারক হোসেন:

হৃদয় হোসেন, সাদ্দাম হোসেন ও নাজমুল হোসেন। এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও রাজনৈতিক নেতাদের নজরে আসতে তাদের মটরসাইকেল প্রয়োজন। কিন্তু কারও মটরসাইকেল কেনার সামর্থ নাই। টাকা জোগাড় করতে নানা ফন্দি ফিকির আটতে থাকেন। এক পর্যায়ে মটরসাইকেল কেনার জন্য তারা সিদ্ধান্ত নেন কাউকে অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় করার। মুক্তিপণের টাকা দিয়ে মটরসাইকেল কিনে রাজনৈদিক দলের সভা-সমাবেশে শোডাউনে অংশ নিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে টাকা-পয়সা ইনকাম করবেন। এমন পরিকল্পনায় অপহরণ করার মত লোক খুজতে থাকেন তারা। সেই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন, অপহরণকৃত ব্যক্তিকে তুলে নেয়ার পর প্রথমে হত্যা করবেন এবং হত্যার শিকার ব্যক্তির পরনের পোশাক চিহ্ন হিসেবে রেখে মুক্তিপণ আদায় করবেন। প্রথমে তারা এলাকার দুজনকে টার্গেট করেন। কিন্তু এরমধ্যে একজন বয়সে বড় হওয়ায় তারা টার্গেট পরিবর্তন করে সাত বছরের শিশু আল-আমীনকে বেছে নেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কৌশলে আল–আমিনকে অপহরণ করে তারা। এরপর শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যার পর জঙ্গলের ভিতর মাটিচাপা দেয়। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য তার পরণের জামাকাপড় বাশঝাড়ে জুলিয়ে রাখে।

নিহত শিশু আল-আমিন মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের বড়বাকা গ্রামে। গত ২৮ আগস্ট সকালে বাড়ির সামনে সাইকেল চালাতে গিয়ে নিখোঁজ হয় সে। পরের দিন সিঙ্গাইর থানায় গিয়ে ছেলের নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি করেন বাবা শহিদুল ইসলাম। ৩১ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে পার্শ্ববর্তী বেরুন্ডি গ্রামের একটি বাঁশঝাড়ে মাটিচাপা দিয়ে রাখা অবস্থায় আল–আমিনের লাশের সন্ধান পায় স্বজনরা।

শিশু আল-আমীনর লাশ উদ্ধারের পর অপহরণকারী তিন বন্ধুর সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। সেই সাথে শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি তাদেরও। হত্যাকাণ্ডের পাঁচদিনের মাথায় গত শুক্রবার (৩ সেপ্টেবম্বর) ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে তারা ধরা পড়েন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) জালে। তারা হলেন, একই গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে হৃদয় (২০), মৃত মেঘার ছেলে নাজমুল হোসেন (৩৫) ও মিজানুর রহমানের ছেলে সাদ্দাম হোসেন (১৭)

শনিবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই মানিকগঞ্জ ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর আলম।

তিনি জানান, গত ২৮ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে বাইসাইকেল চালানোর জন্য শিশু আল-আমিন বাড়ির সংলগ্ন রাস্তায় বের হয়। কিন্তু এক ঘণ্টা পার হলেও সে বাড়িতে ফিরে না আসায় তার মা-বাবা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। বাড়ির আশপাশ ও সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও শিশুটিকে পাওয়া যায়নি। পরেরদিন ২৯ আগষ্ট তার বাবা শহিদুল ইসলাম সিঙ্গাইর থানায় নিখোঁজসংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

৩১ আগস্ট সকাল ১০ টার দিকে স্বজনরা বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে বেরুন্ডি গ্রামে টেমা মিয়ার পরিত্যক্ত ভিটায় একটি বাঁশঝাড়ের ভিতর শিশুর পরিহিত গেঞ্জির অংশ, প্যান্ট ও মাছির আনাগোনা দেখতে পান। সন্দেহ হওয়ায় বাঁশপাতা সরিয়ে মাটি খুঁড়ে একটি প্লাস্টিকের বস্তায় আলামিনের মৃতদেহ দেখতে পান স্বজনরা।

যেভাবে ধরা পড়ল অভিযুক্তরা
মানিকগঞ্জ ইউনিটের পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিখোঁজের পর শিশু আল-আমিনকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। থানা পুলিশের পাশাপাশি আমরা ছায়া তদন্ত শুরু করি। এবং ঘটনার সম্ভাব্য সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। সেই সঙ্গে নিহত আল-আমীনের পরিবার ও স্থানীয় লোকজন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

শিশু আল-আমিনের চলাফেরার সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হৃদয়, সাদ্দাম ও নাজমুল নামে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে শনিবার সকালে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

এসপি জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে ওই তিন তরুণ জানান, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের জন্য যে কাউকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করার পরিকল্পনা করেন তারা। এ জন্য তারা তিনজন প্রথমে আল-আমীনসহ দুটি শিশুর যেকোনো একজনকে অপহরণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এরমধ্যে একজন বয়সে বড় হওয়ায় তারা টার্গেট পরিবর্তন করে শিশু আল-আমীনকে বেছে নেন।

তিনি বলেন, ‘তাদের মুক্তিপণ আদায়ের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রেপ্তার আসামি হৃদয় শিশু আল-আমিনকে বন্যার পানি দেখানোর কথা বলে সাপের ভিটায় (বড় বাঁশঝাড়) নিয়ে যান। সেখানে নাজমুল আগেই অবস্থান করেন। তারা দুজন প্রথমে আল-আমিনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর নাজমুলের কাছে থাকা প্লাস্টিকের বস্তার মধ্যে মৃতদেহ ঢুকিয়ে ফেলেন। ‘আল-আমিনের পরনের গেঞ্জি ও প্যান্ট তারা মুক্তিপণ আদায়ের প্রমাণ হিসেবে খুলে রাখেন। এরপর মরদেহের বস্তাটি বাঁশঝাড়ের কাছাকাছি জায়গায় প্রায় হাঁটু পানিতে ডুবিয়ে রেখে একটি মুরগির নিটারের (বর্জ্য) বস্তা দিয়ে চাপা দেন। এ সময় নাজমুলের ফোন থেকে সাদ্দামকে ফোন দিয়ে হৃদয় বলেন যে কাজ হয়ে গেছে।’

ঘটনার পর আল-আমিনের ব্যবহৃত সাইকেল দিনের বেলায় হৃদয় ও নাজমুল লুকিয়ে রাখেন এবং ওই দিন রাতে হৃদয়দের বাড়ির পশ্চিম পাশে পুকুরে ফেলে দেন। তারা ২৮ আগস্ট আল-আমিনকে হত্যা করলেও ৩০ আগস্ট হৃদয় যে ডোবায় বস্তা পুঁতে রেখেছিলেন সেই বস্তা পানির নিচ থেকে তুলে পাশেই শুকনা জায়গায় মাটিতে গর্ত করে আবারও পুঁতে রাখেন। যে কারণে স্থানীয়রা ওই দিন মৃতদেহ খুঁজে পান।

এসপি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ওই তরুণদের পরিকল্পনা ছিল শিশুটিকে হত্যার পর নতুন সিম থেকে শিশুর স্বজনদের ফোন দিয়ে মুক্তিপণ আদায় করবেন। কিন্তু সাদ্দাম ঘটনার দিন নতুন সিম সংগ্রহ করতে না পারায় আল-আমিনের বাবার সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি তারা। তাই তারা মুক্তিপণও চাইতে পারেননি। মুক্তিপণ চাওয়ার আগেই স্থানীয়রা শিশুটির মৃতদেহ পেয়ে যাওয়ায় তারা এলাকা ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন।’

তিনি বলেন, ‘তারা পালানোর জন্য প্রথমে মানিকগঞ্জ থেকে সাভারের একটি হোটেলে ওঠেন। সেখানে হোটেল বয়ের ফোন থেকে ওই শিশুর বাবার কাছে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চান হৃদয়, কিন্তু তারা ভয়ে ছিলেন যেকোনো সময় ধরা পড়বেন। তাই মুক্তিপণ চাইলেও তারা ওই দিন সাভার থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য যশোরের বেনাপোল সীমান্তে চলে যান।

‘তারা চেয়েছিলেন সেখানে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যাবেন, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারি এবং অবৈধভাবে প্রবেশের জন্য যাদের সহযোগিতা প্রয়োজন তাদের পর্যাপ্ত টাকা দিতে না পারায় তারা পালিয়ে ভারত যেতে ব্যর্থ হন। পরে সেখান থেকে তারা রাজবাড়ীতে পালিয়ে যান। সেখানে আত্মগোপনে থাকার চেষ্টা করলেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে পিবিআইয়ের জালে ধরা পড়েন।

আরও পড়ুন