১৪ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

রাজধানীর চারপাশে বন্যার হানা

জনশক্তি ডেস্ক:

বানের পানি হামলে পড়ছে ঢাকার চারদিকে। ফুলে-ফেঁপে উঠছে চারপাশের নদ-নদী। দিন যত যাচ্ছে, বিপত্সীমার ওপরে পানি ওঠা নদীর সংখ্যা বাড়ছেই। বাড়ছে বিপত্সীমার ওপরে ওঠা স্টেশনের সংখ্যাও। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা ধারণা করছেন। উত্তর জনপদ এখনো বানে ভাসছে, সিলেট অঞ্চলেও দেখা দিয়েছে নতুন করে বন্যার শঙ্কা। রাজধানীতে কিছুটা কমলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় থামছে না আকাশভাঙা বৃষ্টি। তার পরও টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে হাঁসফাঁস করছে রাজধানীবাসী। বেশির ভাগ সড়কে কোমরপানি থাকায় ভোগান্তিকে সঙ্গী করে চলতে হচ্ছে পথ।

জাতিসংঘ ইঙ্গিত দিয়েছে, ১৯৮৮ সালের পর বাংলাদেশের এবারের বন্যা বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। জুলাই পেরিয়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহেও বন্যার পানি থাকতে পারে। জাতিসংঘের মতে, বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাদের হিসাবে এখন পর্যন্ত ১৪ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। যদিও এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি। জাতিসংঘের অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) তথ্য জানিয়েছে, সামনের সপ্তাহে বাংলাদেশের মোট জেলার অর্ধেক বন্যায় কবলিত হবে।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে বালু নদের ডেমরা পয়েন্টে পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে। উত্তরের তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টেও আজ পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর প্রবল সক্রিয় থাকায় কয়েক দিন ধরেই টানা ভারি বর্ষণ হচ্ছে বিভিন্ন জেলায়। সেই ধারা আজও অব্যাহত থাকতে পারে। এই সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও ভারি বর্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অফিসের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ বিভাগের বেশির ভাগ স্থানে হতে পারে মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় পাঁচটি জেলায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। সেগুলো হলো কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা। এ ছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল থেকে আরো বাড়বে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতল থেকে বাড়তে শুরু করেছে। তা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ ছাড়া যমুনা নদীর পানিও আজ থেকে বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

এদিকে রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। ঢাকার পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জে সরকারি হিসাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি। তবে বেসরকারিভাবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি। মঙ্গলবার রাত থেকে আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানি ঢুকছে বাসাবাড়িসহ ঘরের ভেতর। দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। নদীভাঙা লোকজন জায়গা ভাড়া করে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে। লৌহজংয়, টঙ্গিবাড়ী ও শ্রীনগরের যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই পানি আর পানি। প্রতিদিনই এসব এলাকার নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে ভাসছে লৌহজং ও শ্রীনগরের গ্রামের পর গ্রাম। পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য মাছের ঘের। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২০ হাজারেরও বেশি পরিবার। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকট।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের কয়েকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে বানের পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক এলাকার নিচু সড়কে হাঁটু পর্যন্ত পানি উঠেছে। এতে পথচারীরা চলাচলে ভোগান্তিতে পড়েছে। উপজেলার নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকায় প্রতিদিনই পানি ঢুকে পড়ছে। গরু-ছাগল নিয়ে বিপাকে পড়ছে শত শত মানুষ।

মানিকগঞ্জের সাত উপজেলার মধ্যে বন্যাকবলিত হয়েছে দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর। শিবালয়ের আরিচা ঘাট পয়েন্টে গতকাল বুধবার যমুনা নদীর পানি বিপত্সীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ ছাড়া ঘিওর, সাটুরিয়া ও সদর উপজেলার আংশিক দুই দিন ধরে বন্যাকবলিত হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুরে পদ্মা নদীর পানি দুই সেন্টিমিটার কমে এখন তা বিপত্সীমার ১০৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা কয়েক দিন পদ্মার পানি বাড়ার ফলে ফরিদপুর সদর উপজেলা, চরভদ্রাসন ও সদরপুরের ৩০টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় পানির নিচে তলিয়ে গেছে ২৫টির বেশি স্কুল ও মাদরাসা। পাশাপাশি রাস্তাঘাট, হাট-বাজারও তলিয়ে গেছে।

রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় এক সেন্টিমিটার কমলেও তা এখনো বিপত্সীমার ১০৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যে কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরের এলাকাগুলো এখনো বন্যার পানিতে ডুবে আছে। এতে প্রায় ৯ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এরই মাঝে জেলা সদর, পাংশা, গোয়ালন্দ ও কালুখালী এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।

শেরপুরে উজানের দিকে পানি কিছুটা কমলেও ভাটির দিকে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের প্লাবন বইছে। থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে শেরপুর সদরের চরশ্রীপুর কান্দাপাতা এলাকায় উমেলা বেগম (৫০) নামের এক নারী মারা গেছেন।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট জেলাজুড়ে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার সব নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে অথবা কাছাকাছি অবস্থান করছে। সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে অন্য উপজেলাগুলোতেও বন্যার শঙ্কা রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখাসহ বন্যা মোকাবেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গোয়াইনঘাটের ১০টি ইউনিয়নের সব বন্যাকবলিত হওয়ায় অর্ধলাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। গোয়াইনঘাটের কমপক্ষে তিন হাজার ৯০০ হেক্টর জমির ফসল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে গাইবান্ধার সব নদীর পানি ফের বেড়ে যাওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। এর আগে কয়েক দিন ধরে নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় বন্যাকবলিত সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি থেকে পানি কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু নতুন করে নদ-নদীর পানি বেড়ে আবারও ওই সব বাড়িতে পানি উঠতে শুরু করেছে। যমুনার প্রবল স্রোতে সিরাজগঞ্জের বেতিল সলিড স্পারে ফের ধস নেমেছে। এতে মাটির তৈরি স্যাংক

বাঁধের প্রায় ৮০ মিটার এলাকা গতকাল সকালে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানায়, যমুনায় পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে ভাঙন। এলাকার ভাঙন রোধে নির্মিত এই স্পার বাঁধটি দুই দফায় ধস নামায় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

নীলফামারীতে তিস্তার পানিপ্রবাহ বিপত্সীমার ওপরেই রয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টায় ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকালে সেখানে বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিকেল ৩টায় পানি কমে আট সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তিস্তায় পানি বাড়তে থাকায় ডিমলার ১৫ গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন