২৪শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • রাজনীতিতে অবিস্মরণীয় বীর চট্টলার কৃতি সন্তান “আতাউর রহমান খাঁন কায়সার”




  • রাজনীতিতে অবিস্মরণীয় বীর চট্টলার কৃতি সন্তান “আতাউর রহমান খাঁন কায়সার”

    নন্দিত আতাউর রহমান খান কায়সার ছিলেন একাধারে সমাজসেবক, সংস্কৃতিমান, রাজনীতিবিদ, ক্রীড়াবিদ, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক, সাবেক রাষ্ট্রদূত। তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল অকুতোভয় আত্মনিবেদিত চারিত্রিক দূঢ়তা সম্পন্ন রাজনীতিবিদ এবং প্রচারবিমুখ, সৎ, নির্লোভ, নিষ্ঠাবান, নিরহংকার, সদা মিষ্টভাষী, বিজ্ঞ ও সুশিক্ষিত রাজনীতিবিদ। তিনি সবসময় প্রগতির পক্ষে দেশের উন্নয়নে নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন।

    প্রগতিশীল আধুনিক চিন্তাধারার মুক্তমনের মানুষ আতাউর রহমান খান কায়সার চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরাস্থ’ সুবিখ্যাত পৈত্রিক নিবাস বাংশালবাড়িতে ১৯৪০ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা: আলহাজ্ব এয়ার আলী খান, মাতা: গুলশান আরা বেগম সুগৃহিণী ছিলেন। তার নানা ছিলেন তৎকালীন ইষ্ট বেঙ্গলের এমএলএ খান বাহাদুর আব্দুস সাত্তার। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের তৈলারদ্বীপ গ্রামের বিখ্যাত সরকারবাড়ি আতাউর রহমান খান কায়সারের পারিবারিক স্থায়ী আদি নিবাস। পিতামহ জমিদার এরশাদ আলী সরকার। ১৯১৪ সালে জমিদার এরশাদ আলী সরকার আনোয়ারা মধ্য ইংরেজী স্কুলকে উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত করে আনোয়ারায় শিক্ষার আলো সম্প্রসারিত করেছিলেন। আনোয়ারায় এটি ছিল প্রথম উচ্চ বিদ্যাপীঠ। তার পিতা এয়ার আলী খান বঙ্গীয় আইন পরিষদ ও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন।

    আতাউর রহমান খান কায়সারের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী অগ্নি কন্যা মতিয়া চৌধুরীর রাজনৈতিক কর্মী নিলুফারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে। পরে ১৯৬৭ সালে ২২ সেপ্টেম্বর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনে যেমন অটুট ছিলেন, তেমনি রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন তারা দুজন। বলাবাহুল্য আতাউর রহমান খান কায়সার বিদুষী স্ত্রী চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী ও জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ছিলেন।

    সাহসী সৈনিক আতাউর রহমান খান কায়সার মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। দেশ ও মাতৃকার টানে যুদ্ধ করেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে। মার্চের উত্তাল সময়ে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার পেছনে তাঁর রয়েছে অসাধারণ ভূমিকা ও সাহসিকতা। ১৯৭১ সালে ২৬ ও ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে যে ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণা পত্র সংশোধনের ব্যাপারে এ কে খানের পরামর্শে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ১নং সেক্টরের রাজনৈতিক সমন্বয়কারী হিসাবে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আতাউর রহমান খান কায়সার স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র স্থাপন এম এ হান্নানকে দিয়ে কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ এবং ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে কিংবদন্তী রাজনীতিবিদ এম এ আজিজ, আলহাজ জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ হান্নান এবং এম এ মান্নানসহ প্রমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে প্রথম থেকেই জড়িত ছিলেন। জননেতা আতাউর রহমান খান কায়সার তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে সফলতা লাভ করেছেন নিজ গুণে। তার মেধা, শ্রম, সাধনা, ধৈর্য, দূরদর্শী মনোভাব, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার মাধ্যমে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এবং ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানসহ সপরিবার নিহত হলে প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫-১৯৮৭ সাল পর্যন্ত জাতীয় জীবনে অস্থির সময়কাল, এ সময় তিনি রাজপথে ছিলেন। আন্দোলন মিটিং করেছেন। যার ফলশ্র“তিতে দুইবার গ্রেফতার হন এবং ১১মাস কারাভোগ করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক নির্বাচিত হন।

    দেশরতœ শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এলে তিনি ১৯৯৭ সালে প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়ার, ১৯৯৯ সালে রাশিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সম্মানিত রাষ্ট্রদূত হিসাবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান সরকারের আমলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে অর্থবহ পর্যায়ে নেওয়ার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তার ভিত মজবুত হয় আতাউর রহমান খান কায়সার রাষ্ট্রদূত হওয়ার পরে।

    রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খান কায়সার বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া মূল্যায়ন ও চূড়ান্তকরণের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রনালয় কর্তৃক গঠিত সহায়তাকারী অর্থনীতিবিদ প্যানেলে অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করেন এবং তিনি দলের অন্যতম সদস্য হিসাবে ওআইএসসিএ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানকল্পে ১৯৭৪ সালে জাপান সফর করেন। উল্লেখ্য যে, সফল রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরলে সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম চারণভূমি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তাঁকে বিপুল নাগরিক সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে পেরেছিল এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য যে কয়েকজন নেতার ঐকান্তিক ইচ্ছা ও জোরালো ভূমিকা পালন করেন তাঁদের মধ্যে আতাউর রহমান খান কায়সার অন্যতম ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান ব্যতীত অন্য কোনো উপায় নেই। তাই সমস্যার রূপ নির্ধারণ সৃষ্টিশীলতা ইত্যাদি খতিয়ে দেখার এবং পাশাপাশি সমস্যার সমাধানের উপায় নির্ধারণের জন্য ১৯৮৬ সালে আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা একটি কমিটি অনুমোদন দিয়েছিলেন। এই কমিটি গঠনে আতাউর রহমান খান কায়সার প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। দীর্ঘদিনের হোমওয়ার্কের কারণেই ১৯৯৭ সালে স্থায়ী প্রতিষ্ঠার উপায় হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল এবং ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে সফলভাবে। উল্লেখ্য যে, তৎকালীন জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি’র নেতৃত্বে যে জাতীয় কমিটি গঠিত হয়েছিল সেখানে অন্যান্যদের পাশাপাশি তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আতাউর রহমান খান কায়সার তাঁর মেধা, ধৈর্য, শ্রম, বংশগত মর্যাদা, সুশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি হিসাবে তিনি রাজনৈতিক দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছিলেন বলেই জাতীয় কমিটি অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে পার্বত্য সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব করে তুলেছিল।

    রাজনীতির বরপুত্র আতাউর রহমান খান কায়সার গণচীনের কেন্দ্রীয় কমিটির আমন্ত্রণে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাবে চীনের সঙ্গে হংকং এর পুনরেকত্রীকরণ উৎসবে যোগদান করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে জুন-জুলাই-এ চীন সফর করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে গমন করেন।

    শিক্ষানুরাগী আতাউর রহমান খান কায়সার শিক্ষা বিস্তারেও ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৯৭২ সালে আনোয়ারা কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর পরিচালনা পরিষদের আহবায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তাঁরই কলেজ জীবনের বন্ধু লেখক ও কলামিষ্ট মোঃ হোসেন খানকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ডিগ্রী পর্যায়ে উন্নীত করেন। তৈলারদ্বীপ এরশাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং চকরিয়া থানায় রাজাখালী এয়ার আলী খান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম নগরীর চন্দনপুরা গুল-এজার বেগম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও খাসখামা উচ্চ বিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ছিলেন। আনোয়ারা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের তিনি দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মনোনীত সিন্ডিকেট সদস্য হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন।

    একজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, নন্দিত আতাউর রহমান খান কায়সার ছিলেন চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাণপুরুষ। তিনি আজীবন সুখে দুখে সাধারণ জনগণের পাশে থেকে আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনীতিতে তিনি অনুসরণীয় একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন সৎ, ত্যাগী ও সাহসী রাজনীতিবিদ ছিলেন না। দেশ ও জাতি গঠনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের অগ্রসেনানী। তিনি একজন ক্ষণজন্ম পুরুষ। দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। সংস্কৃতিমান, সমাজসেবক রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খান কায়সার তার বর্নাঢ্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ অক্টোবর ২০১০ সালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী ভক্তানুরাগী শিষ্যসহ সকল স্তরের মানুষের হৃদয়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।

    দেশপ্রিয় আতাউর রহমান খান কায়সার ছিলেন এদেশের রাজনীতি, সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একজন প্রত্যক্ষ অভিযাত্রী। এদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয়, বরণীয় ও অনুসরণীয় ইতিহাস হয়ে থাকবে।

    আবু তৈয়ব মোহাম্মদ রাসেল
    প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব
    আতাউর রহমান খান কায়সার স্মৃতি সংসদ,
    সংযুক্ত আরব আমিরাত কেন্দ্রীয় কমিটি

    Print Friendly, PDF & Email

    আরও পড়ুন