২৫শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
লকডাউন বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানে সিঙ্গাইর উপজেলা প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করলেন মানিকগঞ্জ নবাগত জেলা প্রশাসক আব্দুল লতিফ করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘ডেল্টা প্লাস’নিয়ে কেন এত শঙ্কা গোটা বিশ্বের? রাশিয়াকে উড়িয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করলো ডেনমার্ক সিঙ্গাইরে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ, নগদ এজেন্ট মালিককে অর্থদণ্ড প্রথম দিনে নাম নিবন্ধন করেছে ১৯৪জন পাসপোর্ট নাম্বার বিহীন লেবানন প্রবাসী সিঙ্গাইরে ট্রাকচাঁপায় মটরসাইকেল চালকের মৃত্যু একদিন নয়, প্রতিদিন হোক বাবা দিবস ব্র্যাকের মানবিধকার ও আইন সচেতনতা বিষয়ক মতনিময় সভা পরীমনির বাসা যেন মদের বার, প্রতিদিনই বসে আসর

সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা নিত না থানা পুলিশ,সাহেদ দিলে নিত

জনশক্তি ডেস্ক:

আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সাবেক সদস্য ও রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের প্রতিষ্ঠানে ৫৮ লাখ টাকার বালু দেন ইমতিয়াজ হাবীব। গত বছরের আগস্ট মাসে বালু দিলেও টাকা না দিয়ে ঘোরাতে থাকেন সাহেদ। টাকা দেওয়ার কথা বলে গত ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে উত্তরায় রিজেন্টের অফিসে ইমতিয়াজকে ডেকে নেন সাহেদ। সেদিন ইমতিয়াজকে মারধর করেন সাহেদ। গুলি করে হত্যার হুমকিও দেন। মারধরের শিকার হয়ে ইমতিয়াজ উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু থানা মামলা নেয়নি। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন ইমতিয়াজ। কিন্তু সেখানে গিয়েও কোনো ফল পাননি। মামলা নেয়নি পুলিশ।

ভুক্তভোগী ইমতিয়াজ বলেন, ‘সাহেদের প্রতিষ্ঠানে বালু দিয়ে আমি বড় বিপদে পড়ে যাই। সাহেদ নিজের অফিসে ডেকে আমাকে মারধর করেন। সাহেদের সঙ্গে থাকা অস্ত্রধারীরা আমাকে মারধর করেন। সাহেদ নিজে আমাকে লাথি মারেন। মারধরের শিকার হওয়ার পরও আমি থানায় গিয়েছি। থানার ওসির সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু থানা আমার মামলা নেয়নি।’ অবশ্য সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ায় ১৯ জুলাই ইমতিয়াজ বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেছেন।

উত্তরা পশ্চিম থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তপন চন্দ্র সাহা দাবি করেন, সাহেদের বিরুদ্ধে আগে থানায় কেউ মামলা করতে আসেনি।

২০০৯ সাল পর্যন্ত সাহেদের বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় প্রতারণার আটটি মামলা হয়েছিল। ২০১৮ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি স্বারক জাল করে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার অভিযোগে ওই মন্ত্রণালয় উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেন। তবে সাধারণ ভুক্তভোগী কোনো ওই থানায় গিয়ে সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেননি। যাঁরা মামলা করতে গেছেন, তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই কয় দিনে উত্তরা পশ্চিম থানায় ৭টি মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
থানার রেকর্ড বলছে, সাহেদ সেখানে তাঁর কর্মীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছেন। এই মামলার কারণে পরিবার ভোগান্তিতে পড়েছে দিনের পর দিন। সাহেদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন কোটি টাকার রড দেন আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তি। টাকা চাইতে গেলে উল্টো আবুল কালামকে রিজেন্ট গ্রুপের অফিসে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।

ভুক্তভোগী আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাহেদ কক্সবাজারের মহেশখালী, কুতুবদিয়ায়, চকরিয়া, উখিয়ায় সাইক্লোন সেল্টারে সাবকনট্রাক্টে কাজ নিয়েছিলেন। সাহেদ সেখানে আমাদের মাধ্যমে রড-সিমেন্ট দিয়েছিলেন। ওখানে যাঁরা বালু-পাথর-রড দিয়েছিলেন, তাঁদের সবার টাকা আটকে দিয়েছেন। পাওনা টাকা চাইতে আমি সাহেদের অফিসে গেলাম। সাহেদের সঙ্গে থাকা অস্ত্রধারীরা আমাকে অফিসে মারধর করলেন। আমরা উত্তরা পশ্চিম থানায় গেলাম মামলা করতে। কিন্তু থানা কিন্তু আমাদের মামলা নেয়নি। থানা থেকে আমাদের বলা হয়, সাহেদর বিরুদ্ধে আমরা মামলা নিতে পারব না। আমরা সাহেদের বিরুদ্ধে থানায় তখন কিন্তু মামলা করতে পারিনি। সাহেদ এখন গ্রেপ্তার হয়েছেন, আমাদের মামলা এখন থানা নিয়েছে।’

২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আলী হোসেন খান।

সাহেদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, ‘সাহেদ তখন তো আর অত বিখ্যাত কিছু ছিলেন না। আমি উত্তরা পশ্চিম থানায় তিন বছরের মতো ছিলাম। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছিলাম। আমার সময়ে সাহেদের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে গেছেন, এমন কাউকে আমি ফেরত দিয়েছি, এমন কোনো রেকর্ড নেই। আমার থানায় সাহেদের নামে কোনো ওয়ারেন্ট ছিল না। সাহেদকে সবাই যেভাবে চেনেন। আমিও সেভাবে তাঁকে চিনি। সাহেদের মতো বিতর্কিত লোক এসে আমার কাছে চান্স পেতেন না। সাহেদ আমার থানায় আসতেন না।’

ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম হিলালীর টাকাও দেননি সাহেদ। টাকা চাওয়ায় তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। রূপগঞ্জ সেতুর জন্য সাহেদের প্রতিষ্ঠানে বালু সরবরাহ করার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী সাহেদের কোম্পানি গত বছরের ২৬ জুন ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেয়। চুক্তি অনুযায়ী রফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান গত বছরের ৩০ জুলাই ১৫ লাখ টাকার বালু দেয়। সাহেদ তখন রফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠানের নামে একটি চেক দেন। কিন্তু সেই চেক ব্যাংকে ডিজঅনার হয়। চেক জালিয়াতির অভিযোগে সাহেদের নামে ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি মামলা করেন। এরপর সাহেদ রফিকুল ইসলামকে হত্যার হুমকি দেন।

ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সাহেদের বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টে মামলা করি। মামলা করার পর সাহেদ নিজে আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। মামলা উঠিয়ে নেওয়ার জন্য সাহেদের লোকেরা আমার অফিসে এসে আরেক দফা হত্যার হুমকি দিয়ে যান। সাহেদের যাঁরা বডিগার্ড ছিলেন, তাঁদের সবার কাছে সব সময় অস্ত্র থাকত। আমি কেন মামলা করলাম, এ জন্য আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছেন সাহেদ। সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার আগপর্যন্ত আমি ভয়ে থাকতাম।’ সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর রফিকুল ইসলাম গত সপ্তাহে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আমিন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সাহেদের এমন প্রতারণা-জালিয়াতি-অপরাধ সম্পর্কে যাঁদের জানার দায়িত্ব ছিল, তাঁরা অবহেলা করেছেন। আইনানুগ ব্যবস্থা নেননি। যে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে পারেননি, তাঁরা কিন্তু ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারেন। যেসব কর্মকর্তা এত দিন সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা নেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে এখন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করতে পারেন ভুক্তভোগীরা।

মামলা সাহেদের বড় অস্ত্র
রিজেন্ট গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা ছিলেন আরেফিন সোহাগ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার সময় সাহেদের নানা অপকর্ম নিজ চোখে দেখেছেন তিনি। ঠিকমতো বেতন না পাওয়াসহ নানা কারণে রিজেন্টে চাকরি করতে চাননি সোহাগ। সাহেদের সঙ্গে বিরোধের জেরে একদিন আরেফিন সোহাগকে উত্তরা পশ্চিম থানায় নিয়ে টানা আট ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এরপর সোহাগ রিজেন্টের চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে যান। পরে সোহাগের নামে চারটি মামলা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রিজেন্টের সাহেদ নিজে বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় সোহাগের নামে প্রতারণার মামলা করেন। সেই মামলায় সোহাগ ছাড়াও তাঁর মা–বাবাকে আসামি করা হয়। সাহেদের ভয়ে সোহাগ ঢাকা ছেড়েছেন।

আরেফিন সোহাগ বলেন, ‘সাহেদের নতুন কাগজ পত্রিকায় একজন রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করি ২০১৪ সালে। এরপর আমাকে সাহেদ সাহেব, প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। পাশাপাশি আমি তাঁর পিএস হিসেবেও কাজ করতাম। নিজের চোখে দেখেছি সাহেদের অনেক প্রতারণা। কাজ করলেও ঠিকমতো বেতন দিতেন না তিনি। নিজের চোখের সামনে দেখেছি, সাহেদ সাহেব স্টাফদের বেল্ট খুলে মারতেন। নানা প্রতারণা আর ঠিকমতো বেতন না পেয়ে আমি রিজেন্ট থেকে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। এতে ক্ষিপ্ত হন সাহেদ সাহেব। একদিন আমাকে উত্তরা পশ্চিম থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। আমি চাকরি ছেড়ে দিই। এরপর সাহেদ সাহেব আমার নামে একে একে চারটি মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। একটি মামলায় আমার মা–বাবাকেও আসামি করেছেন তিনি। সেই মামলায় আজও আমি ঘুরছি। আমাকে একাধিক দিন হত্যার হুমকিও দিয়েছেন সাহেদ। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা সাহেদের পুরোনো স্বভাব।’

আরেফিন সোহাগের মতো আরেকজন ভুক্তভোগী হলেন আনোয়ার হোসেন। তিনি উত্তরার হোটেল মেলিনার মালিক। গত বছরের ২ নভেম্বর মাসে হোটেলটি ভাড়া নেন সাহেদ। মাসে সাড়ে সাত লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে হোটেল মালিক আনোয়ারের সঙ্গে সাহেদের চুক্তি হয়। হোটেল ভাড়া নেওয়ার পর বদলে যান সাহেদ। মিথ্যা প্রতারণার অভিযোগ এবার সাহেদ হোটেল মালিক আনোয়ারের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মামলা করেন। সেই মামলায় আদালত থেকে আনোয়ারের বিরুদ্ধে পরোনায়া জারি হয়। পাশাপাশি সাহেদ আনোয়ারের বিরুদ্ধে ঢাকার দেওয়ানি আদালতে আরেকটি মামলা করেন।

ভুক্তভোগী আনোয়ার বলেন, ‘সাহেদ যে কত ধুরন্ধর ব্যক্তি, সেটি আমি হাড়ে হাড়ে এখন টের পাচ্ছি। প্রতি মাসে সাড়ে সাত লাখ টাকা ভাড়া দেওয়ার কথা বলে সাহেদ আমার হোটেল ভাড়া নেন। ভাড়া নেওয়ার পর সাহেদ আমার নামে একের পর এক মামলা দিতে থাকেন। সেই মামলায় আমি আদালতে আদালতে ঘুরছি। সাহেদ আমাকে একাধিকবার হুমকি দিয়ে বলেছেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমাকে হত্যা করবেন। ঢাকায় আমাকে থাকতে দেবেন না। আমি সাহেদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করতে গেলে থানা আমার মামলা নেয়নি। একটা জিডি নিয়েছিল, কিন্তু সাহেদ আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন, সেই কথা জিডিতে লেখা যাবে না। আমার সেই কথা কেটে দিতে হয়েছে।’

সাহেদ যে আনোয়ারকে হুমকি দিয়েছেন, তার স্বাক্ষী সাহেদের প্রতিষ্ঠান রিজেন্ট গ্রুপের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফিফ বাবু। তিনি বলেন, সাহেদ আনোয়ার হোসেনকে হুমকি দিয়েছিল। সাহেদ যে কেবল আনোয়ারকে হুমকি দিয়েছেন তা নয়, আনোয়ারের মতো আরও অনেককে সাহেদ হুমকি দিতেন। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করতেন।

রিজেন্ট হাসপাতালে করোনার ভুয়া নমুনা জালিয়াতির মামলায় সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর আনোয়ার সাহেদের বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় গত সপ্তাহে মামলা করেছেন।

গানম্যান নিয়ে চলতেন সাহেদ
আলোচিত টক শো ব্যক্তিত্ব সাহেদ সব সময় ছয়জন অস্ত্রবাহী দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতেন। কেবল নিজে নয়, তাঁর কোম্পানির আরও একজন কর্মকর্তা অস্ত্রবাহী দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতেন। তাঁর নাম আফিফ বাবু। তিনি রিজেন্ট গ্রুপের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করতেন।

আফিফ বাবু বলেন, ‘সাহেদের যাঁরা পিএস, তাঁরাই ক্যাডার, তাঁরাই স্টাফ। সাহেদ তাঁর কর্মচারী নিয়ে চলতেন। সাহেদের ছয়জন গানম্যান শটগান নিয়ে চলতেন। হেলিকাপ্টার ভাড়া করে চলতেন। আমার কোনো গানম্যান ছিল না। আমি উনার (সাহেদের) গানম্যান নিয়ে চলতাম।

আফিফ বাবুর সঙ্গে সাহেদের পরিচয় ২০০৪ সালে। আর সাহেদের রিজেন্ট গ্রুপে আফিফ বাবু ২০১৪ সালে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।

আফিফ বাবু জানালেন, সাহেদের বিরুদ্ধে যে অনেক প্রতারণা মামলা ছিল, সেটি তিনি জানতেন। কিছুদিন সাহেদের লিগ্যাল ডিপার্টমেন্টও দেখাশুনা করেছেন।

সাহেদের হাতে তাঁর প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী মারধরের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন আফিফ বাবু। তিনি বলেন, ‘সাহেদ নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে করতেন। হেলিকাপ্টারে করে চলতেন। তবে সাহেদের কাছে টাকাপয়সা চাইলে তাঁর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন। অপমান করতেন। সব স্টাফকে মারধর করতেন। যদিও আমার গায়ে কখনো আঘাত করেননি। এমন কেউ নেই যে সাহেদ তাকে মারধর করেনি। টাকাপয়সা চাইলে মারধর করতেন। সাহেদের অনেক গাড়ি দেখেছি। কোনটা সাহেদের নিজের গাড়ি, কোনটা ভাড়ার গাড়ি, সেটি আমি জানতাম না। সাহেদ তো একজন আইডল।’ যেখানেই যেতেন ছবি তুলছেন সাহেদ

এমএলএম প্রতারণার নামে ২০১১ সালে ধানমন্ডি থেকে বহু লোকের কোটি টাকা মেরে দেওয়ার অভিযোগ আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদের বিরুদ্ধে। চেক জালিয়াতির মামলায় সাহেদকে ২০১০ সালে ঢাকার একটি আদালত ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন, অর্থদণ্ড ৫৩ লাখ টাকা। সাহেদের নামে সাজার পরোয়ানা আদালত থেকে জারি করা হয়। কিন্তু সাহেদ কখনো ধরা পড়েননি। কেবল এই মামলা নয়, ২০১৭ সালে ফেব্রয়ারি মাসে সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতালে জান্নাতুল ফেরদৌস নামের ১৬ বছরের এক কিশোরীকে চিকিৎসার নামে হত্যা করা হয়, যা পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। সেই মামলায়ও সাহেদের নাম নেই।

২০০৮ সাল থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে সাহেদের নামে ৫০টির বেশি মামলা হয়েছে। ২০০৯ সালে সাহেদ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে তখন সাহেদ জামিনে ছাড়া পান। এরপর ২০০৯ সালের পর থেকে সাহেদ দিনের পর দিন বাংলাদেশের সব টেলিভিশনে টক শো করেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্যও হন। সাহেদ দৈনিক নতুন কাগজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকও হন। আওয়ামী লীগ নেতার পরিচয়ে টক শো করার সুবাদে সাহেদ হয়ে ওঠেন টক শোর প্রিয় মুখ। কেবল তা–ই নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানসহ বঙ্গভবনে প্রায় যেতেন সাহেদ। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সিভিল প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ সব পেশার পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলতেন। সেই ছবি নিজের প্রতিষ্ঠানে যেমন টাঙিয়ে রাখতেন, তেমনি নিজের ফেসবুক পেজে প্রচার করতেন সাহেদ।
সাহেদের ফেসবুক ঘেঁটে দেখা গেল, সাহেদ গণভবনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতেন। সেসব অনুষ্ঠানে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে সেলফি তুলতেন।

একাধিক ভুক্তভোগী জানান, রাজনীতিবিদ, পুলিশসহ প্রশাসনের নানা পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তোলা ছবিগুলোকে সাহেদ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। টাকা চাইলেই পাওনাদারদের হত্যার হুমকি দিতেন।

সাহেদের প্রতিষ্ঠান রিজেন্ট গ্রুপের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফিফ বাবু বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে অবসরে যাওয়া পুলিশ বাহিনীর একজন ডিআইজি প্রায় আসতেন। তিনি সাহেদের সব বিষয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাহেদের প্রতিষ্ঠানে একটি বাহিনীর অবসরে যাওয়া বহু কর্মকর্তা উচ্চ পদে চাকরি করতেন। সাহেদের সঙ্গে প্রশাসনের বড় বড় ব্যক্তির ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। পাওনাদারদের টাকা সাহেদ দিতেন না। সবাই তাঁকে ভয় পেতেন। আমিও সাহেদকে ভয় পেতাম। কারণ সাহেদ কখন কী করে বসেন।

সূত্র: প্রথম আলো’

আরও পড়ুন